প্রিন্ট এর তারিখঃ May 5, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ 05 May 2026, 05:26 ইং
শাপলা চত্বরে নিহত যশোরের মোয়াজ্জেমের পরিবারের এক যুগ

সম্পাদকীয় (বিশেষ প্রতিবেদন)
২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিল শাপলা চত্বরের সেই বিভীষিকাময় রাত পাল্টে দিয়েছিল যশোরের এক সাধারণ দর্জি ও আলেম মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নুর সংসার। সেদিন ঢাকার রাজপথে ঝরেছিল তাঁর প্রাণ, আর সেই সাথে শুরু হয়েছিল তাঁর স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানের এক দশকের দীর্ঘ এক পরীক্ষা। তাঁর দুই মেয়ে উম্মে সুমাইয়া ও উম্মে সাদিয়ার সাথে কথা বলে উঠে এসেছে এক শোকাতুর পরিবারের বেঁচে থাকার করুণ লড়াই।
মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নুর মেজ মেয়ে উম্মে সুমাইয়া জানায়, ৪ মে যশোর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন মোয়াজ্জেম হোসেন। ৫ মে বিকেলে যখন শাপলা চত্বরে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, তখন পরিবারের সদস্যরা তাকে বারবার ফিরে আসার আকুতি জানান। কিন্তু সঙ্গে থাকা মাদ্রাসার প্রায় ৩০০ এতিম ছাত্রকে ফেলে আসতে রাজি হননি তিনি। মৃত্যুর আগে স্ত্রীর সাথে শেষ কথোপকথনে তিনি বলেছিলেন, “শাহানাজ, এখানকার পরিস্থিতি মুখে বলে বোঝানো সম্ভব না। আমার দুই পাশে লাশের স্তূপ। বাচ্চাদের নিয়ে দোয়া করো, আমি যেন শহীদি মর্যাদা পাই।” ওই দিন সন্ধ্যায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন তিনি। ১১ মে যশোর ফেরার পথে অ্যাম্বুলেন্সেই তাঁর মৃত্যু হয়।
এক দশকের পুলিশি আতঙ্ক ও যাযাবর জীবন
বাবার মৃত্যুর পর বিচারের পরিবর্তে জুটেছে অবর্ণনীয় হয়রানি। উম্মে সাদিয়া জানান, বাবার দাফনের পর টানা তিন মাস পুলিশ তাদের বাড়ি ঘিরে রেখেছিল। পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়রা ভয়ে কাছে আসতেন না। বিগত বছরগুলোতে তাদের পরিবারকে ‘জঙ্গি’ ও ‘যুদ্ধাপরাধীর সহযোগী’ তকমা দিয়ে নিয়মিত হুমকি দেওয়া হতো। উম্মে সুমাইয়া বলেন, “গত ৬ বছর পুলিশি হয়রানির ভয়ে আমি বাড়িতে থাকতে পারিনি। যখনই আসতাম, পুলিশ ধরার জন্য হানা দিত। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রাস্তায় আমাদের লাশ ফেলে রাখার হুমকি দিত।” এমনকি জীবনের ভয়ে প্রায় ৬-৭ বছর তারা যাযাবরের মতো মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন।
উপার্জনক্ষম বাবাকে হারিয়ে অকুল পাথারে পড়া পরিবারটির হাল ধরেন তিন বোন। মোয়াজ্জেম হোসেন দর্জি ছিলেন, বাবার সেই স্মৃতি আর পেশাকে পুঁজি করেই বড় তিন বোন মিলে সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন। সেই সামান্য আয়েই চলেছে তাদের দুই ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা ও সংসার। অভাব আর শোকের চাপে মা বারবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হলেও কোনো আত্মীয়কে পাশে পাননি তারা। পরবর্তীতে প্রবাসী ও কিছু আলেমদের সহযোগিতায় মায়ের চিকিৎসা চললেও গত বছর তিনি মারা যান।
দীর্ঘ ১১ বছর পর মুখ খুলছেন এই পরিবারটি। উম্মে সাদিয়া ক্ষোভের সাথে বলেন, “আমার বাবার শরীর বুলেটে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছিল। অথচ যারা এই কাজ করেছে তারা এখনো বুক ফুলিয়ে চাকরি করছে। আমরা কোনো মামলা করার সুযোগ পাইনি, বরং পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। আমরা এই নির্মম হত্যার বিচার ও দোষীদের ফাঁসি চাই।”
যশোরের এক জরাজীর্ণ বাড়িতে আজো এই তিন বোন ও দুই ভাই বয়ে বেড়াচ্ছেন এক দশকের বিভীষিকা। তাদের প্রশ্ন—শুধুমাত্র ইসলামের পথে সমাবেশে যাওয়ার অপরাধে কেন একটি পরিবারকে এক যুগ ধরে এমন ‘সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নির্বাসনে’ থাকতে হলো?
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ স্বপ্নভূমি নিউজ