প্রিন্ট এর তারিখঃ May 17, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ 16 May 2026, 08:02 ইং
নিজেস্ব প্রতিনিধি:
যশোরের ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের অভিশাপ ‘জলাবদ্ধতা’ নিরসন এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিবসা ও পশুর নদী অববাহিকায় টেকসই পলি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কর্মশালায় ভবদহের স্থায়ী সমাধানের জন্য রেগুলেটর সরিয়ে সেতু নির্মাণ, নদী খনন এবং পুনরায় জোয়ারাধার বা টিআরএম (Tidal River Management) চালুসহ স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদী একগুচ্ছ প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয়েছে।
শনিবার (১৬ মে) বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)-এর উদ্যোগে এবং ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (IWM)-এর সহযোগিতায় যশোর শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। “যশোর জেলার ভবদহ এলাকার নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিবসা ও পশুর নদীর অববাহিকার পলি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা” শীর্ষক এই কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, এমপি।
যশোরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আশেক হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রছুল, যশোর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গাজী এনামুল হক এবং যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মোঃ মোক্তার আলী। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খোন্দকার আজিম আহমেদ এনডিসি এবং বাপাউবোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা, নকশা ও গবেষণা) মোঃ রুহুল আমিন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক নাছরিন আক্তার খান। এরপর আইডব্লিউএম-এর পক্ষে সমীক্ষা প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য ও কারিগরি দিক পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন সিনিয়র স্পেশালিস্ট শেখ নাহিদুজ্জামান।
সমস্যার গভীরতা ও অতীতের ব্যর্থতা:
কর্মশালায় জানানো হয়, ভবদহ ও বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে নদীতে অতিরিক্ত পলি জমা, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে জলাবদ্ধতা এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অতীতে টিআরএম কার্যক্রম ইতিবাচক ফল দিলেও বিভিন্ন সামাজিক ও প্রশাসনিক জটিলতায় তা দীর্ঘমেয়াদে চালানো সম্ভব হয়নি। এমনকি ২০২১ সালে ভবদহ রেগুলেটরে ২০টি শক্তিশালী পাম্প স্থাপন করেও এই সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি।
কী আছে নতুন সমীক্ষায়?
আইডব্লিউএম-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমান সমীক্ষার আওতায় যশোর জেলার মনিরামপুর, কেশবপুর, অভয়নগর ও সদর উপজেলা এবং খুলনা জেলার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার প্রায় ৯৮ হাজার হেক্টর এলাকার নদী, খাল ও বিলের জরিপ করা হয়েছে। গাণিতিক মডেলিং, কৃষি, সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ সম্পন্ন করে একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে।
সংকট কাটিয়ে উঠতে সমীক্ষায় বেশ কিছু যুগান্তকারী সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো— বর্তমান ভবদহ রেগুলেটরকে ভেঙে সেখানে সেতু নির্মাণ করা, যাতে নদীর স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটার প্রবাহ নিশ্চিত হয়। এছাড়া নদী খনন, অতিরিক্ত পাম্প স্থাপন, পাইলট চ্যানেল খনন, টিআরএম কার্যক্রম পুনরায় চালু করা এবং নদীর প্লাবনভূমি দখলমুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলের জন্য নতুন সংযোগ খাল নির্মাণ, পুরোনো রেগুলেটর মেরামত ও নতুন অবকাঠামো স্থাপনের পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, ভবদহ অঞ্চলের মানুষের দুঃখকষ্টের স্থায়ী অবসান ঘটাতে এই সমীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে স্থানীয় জনগণের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়, কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞ, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা এবং স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ মতামতের ভিত্তিতে এই সমীক্ষার সুপারিশসমূহ আরও পরিমার্জন ও সংশোধন করে চূড়ান্ত করা হবে।