নিজেস্ব প্রতিনিধি:
জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশিষ্ট সমাজসংস্কারক মো. আজাদুল কবির আরজু স্মরণে যশোরে এক ভাবগম্ভীর পরিবেশে নাগরিক শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বক্তারা তাঁকে ‘জাগরণের মহাপ্রাণ’ আখ্যায়িত করে বলেছেন, আজাদুল কবির আরজু বাংলাদেশের উন্নয়ন চেতনা ও ধারণাকে বদলে দিয়েছেন। তিনি আমৃত্যু নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন সাধারণ মানুষের কল্যাণে।
শনিবার বিকেল ৫টায় নাগরিক শোকসভা কমিটির উদ্যোগে ঐতিহাসিক যশোর টাউনহল মাঠে এই স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক ডা. আবুল কালাম আজাদ লিটুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সদস্য সচিব কাজী মাজেদ নওয়াজ।
আজাদুল কবির আরজুর বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের ওপর স্মৃতিচারণ করে বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা রবিউল আলম, যশোর সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা একরাম উদ-দ্দৌলা, বিশিষ্ট কবি ও লেখক আবদুর রব এবং যশোর পৌরসভার সাবেক মেয়র মারুফুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন, যশোর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মিজানুর রহমান, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হাবিবা শেফা, আরআরএফ-এর নির্বাহী পরিচালক ফিলিপ বিশ্বাস, প্রেসক্লাব যশোরের সাধারণ সম্পাদক এস এম তৌহিদুর রহমান, জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক কামরুল ইসলাম, নির্বাহী পরিচালক মেরীনা আখতার, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপঙ্কর দাস রতন, শহীদ মশিউর রহমান ডিগ্রি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ও কথাসাহিত্যিক পাভেল চৌধুরী, জয়তী সোসাইটির সভাপতি কাজী লুৎফুন্নেসা, নির্বাহী পরিচালক অর্চনা বিশ্বাস, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন সভাপতি সাজেদ রহমান, দৈনিক গ্রামের কাগজের প্রকাশক ও সম্পাদক মবিনুল ইসলাম মবিন, কবি কবির হোসেন তাপস, সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোরের সভাপতি আকরামুজ্জামান এবং জাতীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলনী পরিষদ যশোরের সভাপতি শ্রাবণী সুর প্রমুখ।
শোকসভায় বক্তারা তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, আজাদুল কবির আরজু ছিলেন একজন সমৃদ্ধ, সম্পন্ন ও অনন্য হৃদয়ের মানুষ। তাঁর কর্মময় ও আদর্শিক জীবন আমাদের সবসময় অনুপ্রাণিত করবে। তাঁর মতো একজন খাটি দেশপ্রেমিক মানুষকে আজীবন স্মরণে রাখতে হলে এবং তাঁর কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে তরুণ ও নতুন প্রজন্মের মধ্যে তাঁর আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়া আজ জরুরি হয়ে পড়েছে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রয়াত আজাদুল কবির আরজুর আত্মার শান্তি কামনা করে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, গীতাপাঠ ও বাইবেল থেকে পাঠ করা হয়। তার কর্মময় জীবন নিয়ে ভিডিও ডকুমেন্টরি দেখানো হয়। শ্রদ্ধা নিবেদনের অংশ হিসেবে পরে তাঁর প্রতিকৃতিতে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয় এবং তাঁর জীবন ও কর্মের ওপর ভিত্তি করে সংকলিত ‘জাগরণের মহাপ্রাণ’ শীর্ষক স্মারক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন বা গ্রন্থোন্মোচন করা হয়।
চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি, শনিবার দুপুর ১টা ০৫ মিনিটে শহরের পশ্চিম বারান্দীপাড়ার নিজ বাসভবনে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন মো. আজাদুল কবির আরজু। পরে দ্রুত তাঁকে যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। মৃত্যুর পর তিন দফা জানাজা শেষে, মহৎ এই সমাজসেবকের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর মরদেহ চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার স্বার্থে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দান করা হয়।
উল্লেখ্য, আজাদুল কবির আরজু ছিলেন যশোর অঞ্চলের একজন সুপরিচিত সমাজ উন্নয়নকর্মী ও মানবিক নেতৃত্বের প্রতীক। তিনি জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সমাজের প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নে কাজ করেছেন।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে তিনি যশোরে ‘জাগরণী চক্র’ গড়ে তোলেন। পরে এটি ‘জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন’ নামে একটি বৃহৎ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় রূপ নেয়। প্রতিষ্ঠানটি নারী উন্নয়ন, ক্ষুদ্রঋণ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, শিশু অধিকার, মানবপাচার প্রতিরোধ ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিসহ নানা খাতে কাজ করে আসছে।
আজাদুল কবির আরজু মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশকে মানবিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন থেকেই তিনি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আত্মনিয়োগ করেন। তার কাছে সমাজসেবা ছিল কেবল পেশা নয়, বরং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার একটি আদর্শিক অবস্থান।
তার নেতৃত্বে জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন যশোর ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কার্যক্রম বিস্তৃত করে। বিশেষ করে দরিদ্র নারী ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়নে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা প্রশংসিত হয়। উন্নয়নকর্মী হিসেবে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে ‘আরজু ভাই’ নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন।
২০২৬ সালে তার মৃত্যুতে যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শোকের ছায়া নেমে আসে। মৃত্যুর পরও মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতার এক অনন্য উদাহরণ রেখে তিনি নিজের মরদেহ চিকিৎসা শিক্ষার স্বার্থে দান করেন।