প্রিন্ট এর তারিখঃ May 20, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ 19 May 2026, 07:06 ইং
কোনো বাধাই মানছেন না ট্রাম্প, গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণে নিতে মরিয়া ওয়াশিংটন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের সাথে চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার আর্কটিক বা সুমেরু অঞ্চলের কৌশলগত দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গত চার মাস ধরে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্র, গ্রিনল্যান্ড এবং ডেনমার্কের প্রতিনিধিদের মধ্যে অত্যন্ত গোপনীয় আলোচনা চলছে। মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর ও সংবেদনশীল তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড সামরিকভাবে দখল করার হুমকি থেকে তাকে সরিয়ে আনতে এবং ন্যাটো জোট ভাঙার ঝুঁকি এড়াতে মূলত এই আলোচনার সূত্রপাত। তবে দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের ভূমিকা রাখার প্রস্তাব নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় নেতারা। তারা আশঙ্কা করছেন, ইরানের সাথে সংঘাত কমে এলে ট্রাম্প আবারও পূর্ণ শক্তি নিয়ে গ্রিনল্যান্ডের দিকে মনোনিবেশ করতে পারেন। এমনকি গ্রিনল্যান্ডের কিছু রাজনীতিক আগামী ১৪ জুন ট্রাম্পের জন্মদিনকে ‘সতর্ক থাকার দিন’ হিসেবে ক্যালেন্ডারে চিহ্নিত করে রেখেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র, কোপেনহেগেন ও গ্রিনল্যান্ডের কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি ওই প্রতিবেদনে ওয়াশিংটনের প্রধান ৪টি গোপন এজেন্ডা ফাস করা হয়েছে:
- স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি (ফরএভার ক্লজ): যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫১ সালের প্রতিরক্ষা চুক্তি সংশোধন করতে চাইছে। এর মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড ভবিষ্যতে ডেনমার্ক থেকে স্বাধীন হলেও মার্কিন সেনারা সেখানে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান করতে পারবে। এই ‘চিরস্থায়ী ধারা’ গ্রিনল্যান্ডের নাগরিকেরা একেবারেই পছন্দ করছেন না।
- বিনিয়োগে ভেটো ক্ষমতা: সামরিক বিষয়ের বাইরে গিয়ে গ্রিনল্যান্ডের যেকোনো বড় বিনিয়োগ চুক্তিতে কার্যকর 'ভেটো' দেওয়ার ক্ষমতা দাবি করছে ওয়াশিংটন, যাতে রাশিয়া ও চীনের মতো অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দীদের সেখানে কোণঠাসা করা যায়।
- প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ: বরফের নিচে চাপা পড়ে থাকা গ্রিনল্যান্ডের তেল, ইউরেনিয়াম, রেয়ার আর্থসহ মূল্যবান খনিজ সম্পদ যৌথভাবে উত্তোলনের বিষয়ে চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
- সামরিক সম্প্রসারণ: মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগন ইতোমধ্যে সেখানে সামরিক ঘাঁটি সম্প্রসারণের কাজ শুরু করেছে। সম্প্রতি মার্কিন মারিন কোরের একজন কর্মকর্তা দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের নার্সারসুয়াক শহরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমলের বিমানবন্দর ও বন্দর পরিদর্শন করেছেন।
পেন্টাগনের নর্দার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল গ্রেগরি এম. গুইলোট জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে নতুন নৌপথ উন্মুক্ত হওয়ায় ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এই আর্কটিক অঞ্চলকে রক্ষা করার জন্য আলাস্কা ও কানাডার পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডকেও রাডার স্টেশন ও সামরিক ঘাঁটির একটি আন্তঃসংযুক্ত শৃঙ্খলে যুক্ত করা হবে।
গ্রিনল্যান্ডের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, মার্কিন এই কঠোর দাবিগুলো তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর বড় ধরনের আঘাত। গ্রিনল্যান্ডের পার্লামেন্ট সদস্য জাস্টাস হ্যানসেন বলেন, "আমেরিকানরা যা চায় তার সব পেয়ে গেলে কোনোদিন আমাদের ‘প্রকৃত স্বাধীনতা’ আসবে না।"
একই সুর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য ভিভিয়ান মোটজফেল্ডের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, "ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধ শেষ হলে গ্রিনল্যান্ডের জন্য বিপদ বাড়বে। ট্রাম্প আবারও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে মেতে উঠবেন।"
তবে গ্রিনল্যান্ডের ৩৩ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন কড়া বার্তা দিয়ে বলেছেন, "আমরা অবশ্যই ব্যবসা করতে পারি, তবে আমাদের পরিবেশগত নিয়ম অত্যন্ত কঠোর এবং এটি তেমনই থাকবে। গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতা সম্পূর্ণ আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমেরিকান বা অন্য কারো এতে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।" কার সাথে ব্যবসা করা হবে সে বিষয়ে শেষ কথা বলার অধিকার গ্রিনল্যান্ডের থাকা উচিত বলেও তিনি জোর দেন।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ স্বপ্নভূমি নিউজ