প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 3, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ 03 June 2026, 15:01 ইং

বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি :
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ‘পুশইন’ চেষ্টার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। একই সঙ্গে সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের লাগাতার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভারতকে আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (৩ জুন) দুপুরে যশোরের বেনাপোলের উত্তেজনাপূর্ণ সাদিপুর ও রঘুনাথপুর সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “ভারত খুনি রাষ্ট্র ও বিএসএফ খুনি বাহিনী। তাদের বিচার হতে হবে।” তিনি অভিযোগ করেন, বছরের পর বছর ধরে সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশিদের গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। কোনো সভ্য দেশ এভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যা মেনে নিতে পারে না। সীমান্ত হত্যার প্রতিটি ঘটনার জন্য ভারতকে আন্তর্জাতিক আদালতে জবাবদিহি করতে বাধ্য করার জন্য তিনি বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
বুধবার দুপুরে এনসিপি নেতৃবৃন্দ সাদিপুর ও রঘুনাথপুর সীমান্তে গেলে স্থানীয় শত শত সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে জড়ো হন। এ সময় পুরো এলাকা ‘এ দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা, ঢাকা’, ‘সীমান্ত হত্যা রুখে দিন, চলবে না চলবে না’ ইত্যাদি স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। পরিদর্শনকালে তিনি সীমান্তের শূন্যরেখার কাছাকাছি গিয়ে বিএসএফের ‘পুশইন’ চেষ্টার স্থানগুলো ঘুরে দেখেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগের কথা শোনেন।
সীমান্ত এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখার কেউ নেই। এখানে পর্যাপ্ত হাসপাতাল নেই, ভালো স্কুল নেই, কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থা নেই। জীবিকার তাগিদে সীমান্তবাসী কোনো চোরাচালানে জড়ায় না।” তিনি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, “ভারতীয় চোরাকারবারিরাই এসব অপকর্ম করে এবং পরে বাংলাদেশের নিরীহ মানুষের ওপর দোষ চাপায়। এরপর বিএসএফ তাদের গুলি করে মারে। এটা পরিকল্পিত হত্যা।”
সীমান্ত সুরক্ষায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-কে (বিজিবি) আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করার দাবি জানিয়ে এনসিপির এই নেতা বলেন, “বিজিবির পেছনে দেশের ১৮ কোটি মানুষের সমর্থন রয়েছে। বিজিবির হাতে খেলনা পিস্তল দিয়ে সীমান্ত রক্ষা করা যাবে না।”
বিজিবির সক্ষমতা বাড়াতে তিনি বেশ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন। তিনি সীমান্তরক্ষীদের আধুনিক ভারী অস্ত্র, নাইট ভিশন সরঞ্জাম, ড্রোন ও দ্রুতগামী পেট্রোলিং কার সরবরাহ করার পাশাপাশি বিজিবি সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা ও বেতন কাঠামো বাড়ানোর দাবি জানান।
বিগত সময়ে সীমান্ত হত্যা নিয়ে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, “কোনো বাংলাদেশি নাগরিক যদি অপরাধও করে থাকে, তাকে বিচার ছাড়া সীমান্তে গুলি করে হত্যা করা সরাসরি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন। ভারতের পক্ষ থেকে চোরাচালান ঠেকানোর অজুহাত দেওয়া হলেও নিহতদের মধ্যে কৃষক, রাখাল, এমনকি শিশুও আছে।”
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে দল-মত নির্বিশেষে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “৭১, ৯০ কিংবা ২৪-এর গণ-আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে আমরা বলতে চাই, বাংলাদেশের এক ইঞ্চি ভূখণ্ড বা সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো আঘাত দেশের মানুষ মেনে নেবে না। প্রয়োজনে রক্ত দিয়ে হলেও দেশের সীমান্ত রক্ষা করা হবে।” তিনি সীমান্ত সমস্যাকে কেবল পতাকা বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালোভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, গত ৩১ মে (রোববার) দিনগত রাত থেকে বেনাপোলের বিপরীতে ভারতের হরিদাসপুর সীমান্ত এলাকায় শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশুকে জড়ো করে বিএসএফ সাদীপুর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে। বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে বিএসএফের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং টানা তিন দিন শূন্যরেখায় অবস্থানের পর মঙ্গলবার রাতে বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নেয়।
এ ঘটনার পর থেকে সীমান্তে বিজিবির টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে মাইকিং করে স্থানীয়দের সতর্ক করা হচ্ছে।
তবে স্থানীয়দের মাঝে এখনো আতঙ্ক কাটেনি। সাদিপুর গ্রামের বাসিন্দা আবদুর রহিম বলেন, “আমরা খুব আতঙ্কে থাকি। রাতে ঘুমাতে পারি না। ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতেও ভয় লাগে।” ৩ বছর আগে বিএসএফের গুলিতে স্বামী হারানো ফাতেমা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, “আমার স্বামী গরু আনতে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে মারা গেছে, আজও বিচার পাইনি। নেতারা আসলে একটু সাহস পাই।”
পরিদর্শনকালে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা আরিফুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় সদস্য খালিদ সাইফুল্লাহ জুয়েল, যশোর জেলা সমন্বয়ক সাইফুল ইসলামসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।