• ঢাকা
  • | বঙ্গাব্দ
Techogram

চাঁদা না দিলে উন্নয়ন বন্ধ, শার্শার জিরেনগাছায় ‘ডাবলু বাহিনী’র দাপট


FavIcon
শাহরিয়ার সীমান্ত
নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:২৫
ছবির ক্যাপশন: ad728

শাহারুল ইসলাম ফারদিন, স্টাফ রিপোর্টার :
যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশী ইউনিয়নের জিরেনগাছা গ্রামে চাঁদা না পেয়ে সদ্য নির্মিত একটি সড়কের ইট উপড়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় আরমান হোসেন ওরফে ডাবলু ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ডাবলুর নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজ চক্র জিরেনগাছা, কাশিয়াডাঙ্গা ও মাটিপুকুরিয়া গ্রামে ত্রাস সৃষ্টি করে আসছে।

ভুক্তভোগী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মনিরামপুরের সারুন অ্যান্ড সাফা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী নাসির উদ্দিন বলেন, জিরেনগাছা এলাকায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা ব্যয়ে ৭৩ মিটার সড়কের হেরিংবাঁধাইয়ের কাজ করছিলেন তিনি। ১৫ জানুয়ারি কাজ শুরুর পর ডাবলু তার ছোট ভাইসহ কয়েকজন সহযোগী নিয়ে এসে সরাসরি টাকা দাবি করে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার নেতৃত্বেই সড়কের ইট তুলে ফেলে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ঠিকাদার আরও জানান, শুরুতে জমি সংক্রান্ত অজুহাত দেখালেও পরে সরাসরি কাজ বন্ধ করে শ্রমিকদের ঘটনাস্থল ছাড়তে বাধ্য করা হয়। চাঁদার দাবি না মানায় কাজ শেষের পরদিন ভোরে তিনি খবর পান, নির্মিত সড়কের এক পাশের ইট তুলে ফেলা হয়েছে। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জিরেনগাছা গ্রামের প্রধান সড়ক থেকে আছির উদ্দিনের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ৭৫০ মিটার দীর্ঘ সড়ক নির্মাণকে কেন্দ্র করেই মূলত বিরোধের সূত্রপাত। অভিযোগ রয়েছে, কাজ শুরুর আগেই মাইকিং করে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে, এই সড়ক নির্মাণ করা যাবে না। তখন রাজনৈতিক অজুহাত দেখিয়ে বলা হয়, সড়কটি নির্মিত হলে একটি নির্দিষ্ট পক্ষ সুবিধা পাবে।


এলাকাবাসীর অভিযোগ, ডাবলুর নেতৃত্বে তার ছোট ভাই নবাব, মাটিপুকুরিয়ার সেলিমসহ আশপাশের গ্রামের ২০-২৫ জন যুবক নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্র নিয়মিত চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সহিংসতার মাধ্যমে পুরো এলাকাকে জিম্মি করে রেখেছে। সামাজিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রেও আগে তাদের ‘ম্যানেজ’ করতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

জিরেনগাছা গ্রামের বাসিন্দা ও উলাশী ইউনিয়ন বিএনপির ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোমিনুর রহমান বলেন, ডাবলু একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আমার জানামতে, সে দেড় কোটি টাকার বেশি চাঁদা তুলেছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, গাছ কেনার সময়ও ডাবলু জোরপূর্বক অতিরিক্ত ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা আদায় করে নেয়।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত ১২ জানুয়ারি গ্রামে বেগম খালেদা জিয়ার দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হলেও আগের রাতে ডেকোরেটরের মালামাল পৌঁছানোর পর ডাবলু ও তার সহযোগীরা অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। এ সময় জিরেনগাছা বাজার মোড়ে প্রকাশ্যে দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আরমান হোসেন ওরফে ডাবলু বলেন, আমি এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। সড়ক নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বিরোধ ছিল। আমাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হচ্ছে সেগুলোর অনেকগুলোই ভিত্তিহীন।

উলাশী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল হামিদ বলেন, ডাবলু বিএনপির কর্মী হলেও তার কোনো সাংগঠনিক পদ নেই। আমি কখনো তাকে প্রশ্রয় দিইনি। তবে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি তাকে আশ্রয় দেওয়ায় সে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। তিনি জানান, ডাবলুর বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও বিস্ফোরক আইনে একাধিক মামলা রয়েছে এবং বিষয়টি দলের ঊর্ধ্বতন নেতাদের জানানো হয়েছে।

শার্শা থানা সূত্র জানায়, আরমান হোসেন ডাবলু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি অভিযুক্ত হন। এছাড়া বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি এবং ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ২০২৫ সালের ৭ মার্চ ডিবি পুলিশ তাকে আটক করলেও পরে জামিনে মুক্তি পান। জামিনে বেরিয়ে আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

শার্শা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মারুফ হোসেন বলেন, এ ঘটনায় এখনো থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, থানার রেকর্ডে অভিযুক্তের নামে একাধিক মামলা থাকলেও মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের এখতিয়ার। মামলার সংখ্যা থাকলেই কাউকে অপরাধী বলা যায় না। একই সঙ্গে তিনি জানান, বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় আপাতত কোনো আনুষ্ঠানিক ভিডিও বক্তব্য দেওয়া সম্ভব নয়।