বেনাপোলে মিজান হত্যার ৬ মাসেও রহস্য উন্মোচিত নয়—পরিবারের ভূমিকায় উঠছে প্রশ্ন
শাহরিয়ার সীমান্ত
নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৬:৪৩
মোহাম্মদ হানজালা (শার্শা-বেনাপোল প্রতিনিধি)
বেনাপোলে গরু ব্যবসায়ী ও কসাই মিজানুর রহমানকে নৃশংসভাবে জবাই করে হত্যার ছয় মাস পার হলেও এখনো উন্মোচিত হয়নি এ ঘটনার রহস্য। ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট গভীর রাতে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে চাঞ্চল্য, পাশাপাশি বাড়ছে নানা প্রশ্ন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, নিহতের বাড়িটি ছিল নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টিত। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঘটনার রাতে বাইরে থেকে কোনো ব্যক্তির প্রবেশের দৃশ্য ধরা পড়েনি। তবে রাত সাড়ে ৩টার দিকে চিৎকারের শব্দ রেকর্ড হয়েছে। এর আগে বা পরে কোনো অনুপ্রবেশের চিহ্ন না পাওয়ায় ঘটনাটি আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, এত সুরক্ষিত বাড়িতে বাইরের কারো প্রবেশ না থাকলে হত্যাকাণ্ড কীভাবে ঘটলো—এ প্রশ্নই এখন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই ধারণা করছেন, হত্যার আগে মিজানকে চেতনানাশক কিছু দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। কারণ, এমন নৃশংস ঘটনার সময় তার কোনো চিৎকার শোনা যায়নি।
নিহতের স্ত্রী ফিরোজা খাতুন জানান, রাত আনুমানিক ১১টার দিকে মিজান বাড়িতে ফিরে গেট ও ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে ঘুমাতে যান। পরে ভ্যানচালকের ডাকাডাকিতে তার ঘুম ভাঙে। বাইরে গিয়ে তিনি দেখেন, ঘরের গেট থেকে প্রায় তিন গজ দূরে তার স্বামী রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার দিন এক ব্যক্তি ৮০ হাজার টাকা পাওনার দাবি নিয়ে বাড়িতে এসেছিলেন এবং মিজান তাকে শনিবার টাকা দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তবে ওই ব্যক্তির নাম-পরিচয় বা ঠিকানা সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি। এমনকি কার কাছে কত টাকা পাওনা ছিল, সে বিষয়েও নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে না পারায় তার বক্তব্য নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এছাড়া, মামলার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নিহতের স্ত্রী বলেন, আমার যা যাওয়ার সে তো চলেই গেছে, আমি আর মামলা করে কি করব? আমি কারো নামে মামলা করতে চাই না।” স্বামীর নৃশংস হত্যার পরও মামলা না করার এমন মনোভাবকে অনেকেই অস্বাভাবিক ও প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে দেখছেন।
সিসিটিভির ভয়েস রেকর্ড নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। ফুটেজে দেখা যায়, স্ত্রী উচ্চস্বরে কান্না শুরু করলেও মেয়ে ফাতেমার কণ্ঠ ছিল স্বাভাবিক। বাইরে এসে সে কেবল জিজ্ঞেস করে,কে মেরেছে?এরপর আর কোনো প্রতিক্রিয়া শোনা যায়নি। একইভাবে, রাত পৌনে ৩টার দিকে মায়ের কান্নার পরও ছেলে মুরসালিনের ঘুম না ভাঙা নিয়েও আলোচনা চলছে। জানা গেছে, সে রাত ১২টা পর্যন্ত বন্ধুদের সঙ্গে মোবাইলে গেম খেলেছিল। এ বিষয়ে পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট বন্ধুদের সঙ্গেও কথা বলেছে।
বেনাপোল পোর্ট থানার এসআই রাশেদ আলী বলেন, মেডিকেল রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর সঠিক কারণ বলা যাচ্ছে না। রিপোর্ট হাতে পেলে তদন্তে অগ্রগতি হবে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির প্রতিটি দিক গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বাড়ির ভেতরে অনুপ্রবেশের প্রমাণ না থাকা, চিৎকারের অনুপস্থিতি, পরিবারের সদস্যদের আচরণ, স্ত্রীর বক্তব্যে অসঙ্গতি এবং মামলা না করার ঘোষণা—সব মিলিয়ে হত্যাকাণ্ডটি ঘিরে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে দায়ী করেনি।
রহস্যে ঘেরা এ হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। মেডিকেল ও ফরেনসিক রিপোর্ট প্রকাশের পরই হয়তো সামনে আসবে এই নৃশংস হত্যার পেছনের প্রকৃত সত্য।
আপনার মতামত লিখুন :