• ঢাকা
  • | বঙ্গাব্দ
Techogram

সিন্ডিকেটের থাবা ও ঋণের বোঝা: মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় রাজারহাটের চামড়া ব্যবসায়ীরা


FavIcon
শাহরিয়ার সীমান্ত
নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১৯ মে ২০২৬, ৬:৫৭
ছবির ক্যাপশন: ad728

স্টাফ রিপোর্টার :
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা মন্দা কাটিয়ে উঠতে চান দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ পশুর চামড়ার হাট যশোরের রাজারহাটের ব্যবসায়ীরা। বিগত সরকারের আমলে নীতিগত ভুল ও সিন্ডিকেটের কারণে ধস নামা এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন ও গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে সময়োপযোগী পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ, ট্যানারি মালিকদের কাছে আটকে থাকা বকেয়া টাকা আদায় এবং একটি সমন্বিত বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল এই শিল্পের পুরনো জৌলুস ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

সরেজমিনে রাজারহাট ঘুরে দেখা যায়, কোরবানির মৌসুমের শুরুতেই নানা সংকটে জর্জরিত মাঠপর্যায়ের ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। যশোর সদর উপজেলার রাজারহাটের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আব্দুল হামিদ জানান, বিগত বছরগুলোতে পৈত্রিক জমিজমা ও সঞ্চয় হারানোর পর গত বছর ১ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে চামড়া কিনেছিলেন। কিন্তু লাভ তো দূরের কথা, বকেয়া পড়া আসল টাকাই এখনও তুলতে পারেননি। এবারও লোকসান পোষানোর মরিয়া চেষ্টায় সমিতি থেকে আবারও ১ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন তিনি। বুকভরা আশঙ্কা নিয়ে তিনি বলেন, "চামড়ার জগৎ থেকেই তো আমরা হারায়ে গেলাম। ৩০-৩৫ টাকা ফুট চামড়া বিক্রি হচ্ছে, তাও আমরা ক্ষুদ্র পার্টিরা কিনবো কী করে? আমরা তো শেষ হয়ে গেলাম।"

ব্যবসায়ীরা জানান, ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে প্রতি বছর কোরবানির ঈদ এলেই চামড়ার দাম রহস্যজনকভাবে কমে যায়। বর্তমানে বাজারের প্রকারভেদে প্রতি ফুট চামড়া ১৫ থেকে ৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা দুই মাস আগের তুলনায় ফুটপ্রতি অন্তত ১০ টাকা কম। অথচ এক মাসের ব্যবধানে চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপাদান লবণের দাম বস্তাপ্রতি ৮৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৯০০-৯৫০ টাকায় ঠেকেছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পরিবহন খরচও।

অন্য এক চামড়া ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে আমরা কোনো পেমেন্ট পাচ্ছি না। চলমান আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যদি চামড়া বিদেশে রপ্তানি ব্যাহত হয়, তবে ব্যবসায়ীরা চরম বিপর্যয়ে পড়বেন। ট্যানারি মালিকরা যদি কোরবানির আগে আমাদের সম্পূর্ণ টাকা বুঝিয়ে দেন, তবেই আমরা ব্যাপক আকারে চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিতে পারবো।"

এদিকে বিগত সরকারের ভুল নীতির কারণে ঐতিহ্যবাহী এই হাটটি ধ্বংসের মুখে পড়েছে বলে দাবি করেছেন রাজারহাট চামড়ার হাটের নতুন ইজারাদার রাজু আহমেদ। প্রায় অর্ধ কোটি টাকা দিয়ে এবারের হাট ইজারা নেওয়া রাজু আহমেদ বলেন, "বিগত ১৭ বছরে আগের সরকার পরিকল্পিতভাবে এই শিল্পটাকে ধ্বংস করেছে। এক সময়ের কোটি কোটি টাকার এই হাটের বড় বড় ব্যবসায়ীরা আজ নিঃস্ব হয়ে কেউ চা বিক্রি করছেন, কেউ ইজিবাইক চালাচ্ছেন। তবে নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক।"

তিনি আরও উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে কেমিক্যালের দাম ৩০ হাজার টাকা থেকে এক লাফে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকায় ঠেকেছে, যা ট্যানারি মালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে দামের সংশয় ও আতঙ্ক তৈরি করেছে। তা সত্ত্বেও দেশের একটি অন্যতম প্রধান রাজস্ব আয়ের খাত হিসেবে চামড়া শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি গিয়াসউদ্দিন বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, "কোরবানির সময় চামড়ার দাম কমে যাওয়ার পেছনে এক অদৃশ্য সিন্ডিকেট কাজ করে। বর্তমানে খারাপ চামড়া ১৫ টাকা এবং ভালো চামড়া ৪০ টাকা ফুট বিক্রি হচ্ছে। আমাদের মূল আশা নতুন সরকারের ওপর। চামড়া ব্যবসার মূল সমস্যা হলো পেমেন্ট। ব্যবসায়ীদের হাতে টাকা থাকলে চামড়ার দাম এমনিতেই বেড়ে যায়।"

দক্ষিণবঙ্গের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র রাজারহাটের চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুত ও দায়িত্বশীল হস্তক্ষেপই এখন এই অঞ্চলের হাজারো মানুষের একমাত্র ভরসা।