বন্ধ হরমুজ প্রণালি: অন্ধকারে ডুবছে বিশ্ব জ্বালানি পথ
শাহরিয়ার সীমান্ত
নিউজ প্রকাশের তারিখ : ০৫ মার্চ ২০২৬, ০৩:৩২
নিজস্ব প্রতিবেদক
ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলাকে কেন্দ্র করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের প্রধান জ্বালানি তেল পরিবহন রুটটি অচল হয়ে পড়ায় বিশ্বব্যাপী তীব্র জ্বালানি সংকটের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশেও। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার কারণে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) নিয়ে একটি বিশাল জাহাজ সৌদি আরবের বন্দরে আটকা পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দরে অন্তত ৭০০ জ্বালানি তেলবাহী মাদার ট্যাংকার আটকা পড়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মালিকানাধীন ‘এমটি নর্ডিক পলাঙ’ নামক জাহাজটি গত ২ মার্চ সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা ছিল। এক লাখ টন তেল নিয়ে জাহাজটি এখন বন্দরে অলস বসে আছে। এছাড়া আগামী ২২ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আরও এক লাখ টন তেল নিয়ে আরেকটি জাহাজের শিডিউল থাকলেও তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ERL) এখন কাঁচামাল সংকটের মুখে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ হাসনাত জানান, সাধারণত জাহাজ রওনা দেওয়ার ১৩-১৪ দিন পর তা রিফাইনারিতে পৌঁছায়। বর্তমানে তাদের কাছে এক মাসের কাঁচামাল সংরক্ষিত থাকলেও আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জাহাজ রওনা করতে না পারলে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের স্থবিরতা নামতে পারে। পতেঙ্গার এই শোধনাগারটি বন্ধ হয়ে গেলে ডিজেল, অকটেন ও জেট ফুয়েলের সরবরাহ ব্যবস্থায় মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হবে।
যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বিপিসি সূত্র জানায়:
- ডিজেল: গত মাসের ৮৫ ডলারের ব্যারেল বুধবার ১১৮ ডলারে ঠেকেছে।
- ফার্নেস অয়েল: প্রতি টন ৪২৬ ডলার থেকে বেড়ে ৫২৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
- অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনসহ সব ধরনের জ্বালানির দাম বাড়ায় আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে।
বিপিসির তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ডিজেলে ২৬ দিন, অকটেনে ১২ দিন, পেট্রোলে ১৩ দিন এবং জেট ফুয়েলে ২৮ দিনের মজুত রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মজুত দীর্ঘস্থায়ী সংকটের জন্য যথেষ্ট নয়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার মানজারে খোরশেদ আলম বলেন, "সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ার পর আমাদের হাতে বড়জোর আর তিন সপ্তাহ সময় আছে। এখনই বিকল্প হিসেবে আবুধাবির জায়েদ বন্দর ব্যবহার করা কিংবা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে পরিশোধিত তেল আনার চুক্তি করতে হবে।"
নতুন সরকারের জন্য এই আকস্মিক সংকট মোকাবিলা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপিসির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির বাইরে হঠাৎ করে সাপ্লাই চেইনে পরিবর্তন আনা কঠিন। তবুও মন্ত্রণালয় ও বিপিসি যৌথভাবে বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে।
বিশ্বের জ্বালানি তেলের বড় অংশ পরিবহনকারী হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে শুধু আমদানি ব্যয়ই বাড়বে না, বরং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থায়ও ধস নামতে পারে। তাই কালবিলম্ব না করে কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আপনার মতামত লিখুন :