• ঢাকা
  • | বঙ্গাব্দ
Techogram

শেষ হলো ডিসি সম্মেলন, কি বার্তা নিয়ে ফিরছেন ডিসিরা?


FavIcon
সাইফুল্লাহ খালিদ
নিউজ প্রকাশের তারিখ : ০৭ মে ২০২৬, ০৩:১৪
ছবির ক্যাপশন: ad728

স্বপ্নভূমি ডেস্ক:
রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে গত ৩ মে শুরু হওয়া চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন বুধবার (৬ মে) বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এই প্রথম সম্মেলনে সরকারের নীতিনির্ধারকরা ডিসিদের দেওয়া ৪৯৮টি প্রস্তাব নিয়ে মোট ৩৪টি অধিবেশনে বিস্তারিত আলোচনা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি ত্বরান্বিত করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, গায়েবি মামলা প্রত্যাহার এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মাঠ প্রশাসনকে আরও কার্যকর, জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক করার একগুচ্ছ বার্তা নিয়ে নিজ নিজ জেলায় ফিরছেন জেলা প্রশাসকরা।

ডিসি সম্মেলনের প্রথম দুই দিনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অধীনে সংস্কৃতি, পর্যটন, অর্থনীতি, কৃষি ও শিল্পসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতের উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সংস্কৃতি রক্ষায় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণ, রাজবাড়ি সংস্কার এবং নতুন শিল্পকলা একাডেমি ভবন নির্মাণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পর্যটন খাতের প্রসারে কক্সবাজারসহ পর্যটন কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নতুন হোটেল-মোটেল নির্মাণ এবং সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়ন, ক্যাশলেস লেনদেন চালু এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা মূল্যায়ন ও রাজস্ব আদায় বাড়াতে মাঠ প্রশাসনের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করা হয়। কৃষি ও মৎস্য খাতে চিংড়ি উৎপাদন বৃদ্ধি, মা ইলিশ সংরক্ষণ এবং আলুর বহুমুখী ব্যবহার ও রপ্তানি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। 

এছাড়া শিল্প ও বাণিজ্য প্রসারে বন্ধ কারখানা চালু করা, নতুন শিল্পনীতি প্রণয়ন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।

সম্মেলনের তৃতীয় দিনে যোগাযোগ, প্রযুক্তি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যোগাযোগ খাতের উন্নয়নে মহাসড়কে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, যানবাহনের লোড নিয়ন্ত্রণ এবং চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নতুন সেতু নির্মাণ ও রেলপথ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। এছাড়া নৌপথে নিরাপত্তা জোরদার এবং আসন্ন ঈদে যানজট নিরসনে মাঠ প্রশাসনকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পানি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নদী-খাল পুনঃখনন, নদীভাঙন রোধ এবং বজ্রপাত থেকে কৃষকদের রক্ষায় বিশেষ শেল্টার নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রযুক্তি ও বিদ্যুৎ খাতে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, ক্ষতিকর ওয়েবসাইট নিয়ন্ত্রণ এবং আইটি পার্ক চালুর পাশাপাশি সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া এবং জ্বালানি খাতের অনিয়ম রোধে কঠোর ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। প্রতিরক্ষা খাতে সিভিল-মিলিটারি সমন্বয় জোরদার এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক খাতে ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হালনাগাদের ওপর জোর দেওয়া হয়। পরিকল্পিত নগরায়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি অবৈধভাবে বিদেশ যাত্রা বন্ধ করে দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে জনমুখী সেবা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়ে এই অধিবেশনগুলো শেষ হয়।

এদিন ভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ভূমির অবৈধ দখল উচ্ছেদ, অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার জটিলতা নিরসন, জলমহাল পুনঃখনন এবং ভূমি অফিসে জনবল সংকট দূর করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ভূমি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ভূমি মেলার আয়োজনের বিষয়ও আলোচনায় আসে।

ডিসি সম্মেলনের চতুর্থ ও শেষ দিনে পরিবেশ, সমাজকল্যাণ, স্বরাষ্ট্র ও তথ্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের অধিবেশনে একগুচ্ছ জনকল্যাণমুখী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। 

পরিবেশ রক্ষায় সারাদেশে বৃক্ষরোপণ, বনভূমি উদ্ধার এবং পাহাড় কাটা ও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামে সুপেয় পানির ব্যবস্থা ও বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় প্রতিটি জেলায় ডে-কেয়ার সেন্টার নির্মাণ, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন এবং শিশুদের শারীরিক বিকাশে ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি আলোচনায় আসে। এছাড়া প্রতিবন্ধী সেবা কেন্দ্র সম্প্রসারণ ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাদক, কিশোর গ্যাং ও মবসন্ত্রাস দমনে প্রশাসনকে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার প্রয়োজনে নতুন পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন, কারাগারে সংশোধনমূলক কার্যক্রম জোরদার এবং শিল্প এলাকায় অগ্নিকাণ্ড রোধে ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে জেলা পর্যায়ে তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ এবং আধুনিক সম্প্রচার অবকাঠামো গড়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

অন্যদিকে, দুর্নীতি প্রতিরোধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সততা স্টোর চালু এবং উপজেলা পর্যায়ের কমিটিগুলোকে আরও সক্রিয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের মাঠে ফিরিয়ে আনতে নতুন স্টেডিয়াম ও সাঁতারপুল নির্মাণের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের শেষ দিনের আলোচনা সম্পন্ন হয়।

এবারের ডিসি সম্মেলনে মাঠ প্রশাসনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, উন্নয়ন প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা জোরদার এবং প্রযুক্তিনির্ভর টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

সম্মেলনের শেষ দিন একটি অধিবেশন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় ইস্যু করা প্রায় ১০ হাজার লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্র এখনও জমা পড়েনি। এই বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার দ্রুত উদ্ধারের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে মামলা ও অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করতে বলা হয়েছে। এছাড়া ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত নীতিবহির্ভূতভাবে দেওয়া লাইসেন্সগুলো জেলা পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিগত সরকারের আমলে দায়ের করা রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক ‘গায়েবি’ মামলাগুলো প্রত্যাহারের বিষয়েও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জানান, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও এসপিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি এসব আবেদন যাচাই করবে, তবে হত্যা, অস্ত্র বা মাদক পাচারের মতো গুরুতর অপরাধের মামলা এই প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে না। ৫ আগস্ট পরবর্তী বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মামলাগুলোতে যাতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি বা সাংবাদিক অযথা হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে কড়া নজর রাখতে ডিসিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত আসামিদের দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের নিষ্কৃতি দিতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণেরও তাগিদ দেওয়া হয়।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন ডিসি সম্মেলনে তার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নেওয়া উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি জানান, জেলা প্রশাসকদেরসঙ্গে সরকারের এই মতবিনিময় সভা একটি রুটিন কর্মসূচি, যেখানে প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনের পর পর্যায়ক্রমে মন্ত্রীরা তাদের পরামর্শ প্রদান করেন। 

সম্মেলনে তিনি গুরুত্ব দিয়ে বলেন যে, বর্তমানে দেশ একটি রূপান্তরিত গণমাধ্যম ইকোসিস্টেমের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আগের গৎবাঁধা চিন্তাধারার বাইরে এসে সমস্যাগুলোকে গভীরভাবে বোঝার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

মন্ত্রণালয়ের অগ্রাধিকারমূলক কাজের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে ভুল তথ্য (মিস-ইনফরমেশন) এবং অপতথ্য (ডিস-ইনফরমেশন) মোকাবিলা করা অত্যন্ত জরুরি। এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে গণমাধ্যমের সঙ্গে নিরবিচ্ছিন্ন সংযোগ রক্ষা এবং প্রয়োজনীয় নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে আনার দিকেই মন্ত্রণালয় এখন সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

দুদক সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম ডিসি সম্মেলনে জানান, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বর্তমান কাঠামো এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্পর্কে জেলা প্রশাসকদের ধারণা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি এবং গণশুনানিগুলোতে জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে জোরালো সহযোগিতা আশা করছে কমিশন।

সচিব আরও উল্লেখ করেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা ও নৈতিকতা ছড়িয়ে দিতে সততা স্টোর চালু করা হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে এই স্টোরগুলো কাঙ্ক্ষিতভাবে কাজ করছে না। জেলা প্রশাসকরা যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে যাবেন, তখন যেন এই স্টোরগুলোর কার্যকারিতা নিয়মিত তদারকি করেন। 

দুর্নীতি প্রতিরোধে মাঠ পর্যায়ে যেকোনো প্রয়োজনে কমিশন থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাসও দেন তিনি।