রোমাঞ্চকর অতিরিক্ত সময়ে কেপ ভার্দেকে হারিয়ে শেষ আটে মেসিরা, প্রতিপক্ষ মিসর
শাহরিয়ার সীমান্ত
নিউজ প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৭:০৭
স্পোর্টস ডেস্ক:
লিওনেল মেসির জাদুকরী ফ্রি-কিক, লাউতারো মার্টিনেজের জোরালো শট কিংবা থিয়াগো আলমাদার একের পর এক আক্রমণ—সবই বারবার প্রতিহত হচ্ছিল কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহার অতিমানবীয় দেয়ালে। ম্যাচের আগে দেওয়া ‘সেরাটা দেওয়ার’ প্রতিশ্রুতি যেন মাঠের পারফরম্যান্সে কয়েকশো গুণ বাড়িয়ে প্রমাণ করলেন তিনি। ভোজিনহার এমন অনবদ্য পারফরম্যান্সে নির্ধারিত ৯০ মিনিট ১-১ সমতায় শেষ হলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। যখন পেনাল্টি শুটআউটের ভাগ্য উঁকি দিচ্ছিল, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে হাজির ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। তাঁর হেডই শেষ পর্যন্ত গড়ে দিল ম্যাচের ভাগ্য। বাকি দুটি গোল এলো লিওনেল মেসি ও লিসান্দ্রো মার্টিনেজের পা থেকে। শেষ পর্যন্ত লড়াকু কেপ ভার্দেকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল (শেষ আট) নিশ্চিত করল আর্জেন্টিনা। শেষ ষোলোর এই বৈতরণী পার হয়ে শেষ আটে আলবিসেলেস্তেদের প্রতিপক্ষ এখন আফ্রিকান পরাশক্তি মিসর।
মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল ও আক্রমণে একচ্ছত্র আধিপত্য দেখায় আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ১৫ মিনিটেই প্রথম বড় সুযোগ পান অধিনায়ক লিওনেল মেসি, তবে তাঁর বাঁ পায়ের শটটি অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ১৮ মিনিটে ফ্রি-কিক এবং ১৯ মিনিটে নাহুয়েল মোলিনার পাস থেকে মেসির নেওয়া টানা দুটি শট দারুণ দক্ষতায় প্রতিহত করেন কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা। কেপ ভার্দে শুরু থেকেই ‘ডিপ ডিফেন্স’ বা নিচু রক্ষণে খেললেও সুযোগ পেলেই কাউন্টার অ্যাটাকে ওঠার চেষ্টা করছিল, তবে আর্জেন্টিনার সংগঠিত ডিফেন্স তা শক্ত হাতে সামাল দেয়।
ম্যাচের ২৯ মিনিটে অবশেষে কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পায় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। লিসান্দ্রো মার্টিনেজের অসাধারণ এক লং পাস ডি-বক্সে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অত্যন্ত সংকীর্ণ কোণ থেকে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে জাল খুঁজে নেন লিওনেল মেসি (১-০)।
এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে টানা পাঁচ ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তি গড়েন মেসি। এর আগে এই রেকর্ড ছিল ব্রাজিলের ভাভা, লিওনিদাস এবং হাঙ্গেরির জর্জি সারোসির দখলে। শুধু তাই নয়, ৩৯ বছর ৯ দিন বয়সে গোল করে তিনি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে গোল করা সবচেয়ে বয়স্ক দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলার হয়ে গেছেন। তিনি ভেঙেছেন উরুগুয়ের কিংবদন্তি ওবদুলিও ভারেলার ১৯৫৪ সালের (৩৬ বছর বয়সে করা) সাত দশকের পুরোনো রেকর্ড। একই সঙ্গে শেষ আটটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে এটি ছিল মেসির টানা দ্বাদশ গোল। প্রথমার্ধের শেষদিকে এনজো ফার্নান্দেজের একটি শটও ভোজিনহা রুখে দিলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় স্কালোনির শিষ্যরা।
দ্বিতীয়ার্ধে যেন অন্য এক কেপ ভার্দের দেখা মেলে। সমতায় ফিরতে মরিয়া আফ্রিকার দলটি আক্রমণের ধার বাড়ায়। ৫৪ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের একটি ভুল ক্লিয়ারেন্স থেকে তৈরি হওয়া নিশ্চিত সুযোগ দুর্দান্ত সেভে নস্যাৎ করেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। তবে ৫৯ মিনিটে আর রক্ষা হয়নি; রায়ান মেন্ডেসের ডান প্রান্তের নিচু ক্রস থেকে ডেরয় দুয়ার্তে ‘এমি’ মার্টিনেজের পায়ের ফাঁক দিয়ে বল জালে জড়ালে সমতায় ফেরে কেপ ভার্দে (১-১)।
গোল হজমের পর মরিয়া আর্জেন্টিনা একের পর এক আক্রমণ শানায়। ৬২ মিনিটে মেসির শট, ৬৭ মিনিটে এনজো ও নিকোলাস গনসালেসের যৌথ প্রচেষ্টা এবং ৭৩ ও যোগ করা সময়ে মেসির দুর্দান্ত দুটি ফ্রি-কিক ও এনজোর হেড—সবই আটকে যায় ভোজিনহার অবিশ্বাস্য সেভে। ৮১ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেসের শট গোললাইন থেকে ক্লিয়ার করেন রবার্তো লোপেস। নির্ধারিত সময় ১-১ সমতায় শেষ হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে।
উল্লেখ্য, আর্জেন্টিনার জন্য অতিরিক্ত সময় যেন বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের এক চেনা অধ্যায়। তাদের সবশেষ ১৩টি নকআউট ম্যাচের মধ্যে সাতটিই গড়িয়েছে অতিরিক্ত সময়ে, যার মধ্যে রয়েছে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই মহাকাব্যিক লড়াই দুটিও।
অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই (৯২ মিনিটে) কর্নার থেকে উড়ে আসা বল দূরের পোস্টে পেয়ে জোরালো শটে আর্জেন্টিনাকে আবারও এগিয়ে নেন ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্টিনেজ (২-১)। তবে কেপ ভার্দেও সহজে দমে যাওয়ার পাত্র ছিল না। ১০৩ মিনিটে সিডনি লোপেজ কাবরাল বক্সের বাইরে থেকে আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারকে কাটিয়ে এক চোখধাঁধানো বাঁকানো শটে বল জালের টপ কর্নারে পাঠিয়ে স্টেডিয়ামে স্তব্ধতা নামিয়ে আনেন (২-২)। এর দুই মিনিট পরই হুলিয়ানের পাস থেকে মেসির আরেকটি নিশ্চিত গোল বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে রুখে দেন ভোজিনহা।
ম্যাচের চরম নাটকীয়তা তখনো বাকি। ১১১ মিনিটে লিওনেল মেসির মাপা কর্নার থেকে বক্সে উড়ে আসা বলে হেড করেন ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, যা কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার বারগেসের গায়ে লেগে আত্মঘাতী গোল হিসেবে জালে জড়ায় (৩-২)। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে কেপ ভার্দে ফ্রি-কিক থেকে সমতা ফেরানোর শেষ কামড় বসিয়েছিল, তবে এবার ‘বাজপাখি’ খ্যাত এমিলিয়ানো মার্টিনেজ ডান দিকে ঝাঁপিয়ে দুর্দান্ত এক সেভ করে আর্জেন্টিনার কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেন।
আপনার মতামত লিখুন :