অসচেতনতায় যশোরে বাড়ছে হাম, মার্চ মাসে আক্রান্ত ২২ শিশু
শাহরিয়ার সীমান্ত
নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৩০ মার্চ ২০২৬, ১১:১৮
স্টাফ রিপোর্টার :
যশোরে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। চলতি মার্চ মাসে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল ২২ শিশু এ রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। যশোরে হামে আক্রান্ত শিশুদের অধিকাংশেরই বয়স ৯ মাসের কম বয়সী। জেলায় মোট আক্রান্ত ২২ জনের মধ্যে ১৭ জনেরই বয়স নয় মাসের কম। বাকীদের বয়স এক বছরের বেশি। নিয়মানুযায়ী ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের হামে টিকা দেওয়ার সুযোগ নেই। এই শিশুরা মায়ের শরীরের ইমিউনিটি থেকেই প্রতিরোধ পাওয়ার কথা। কিন্তু কেন পাচ্ছে না, সেটি অধিকতর গবেষণার বিষয়। ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়া উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৯ মাস বয়সী সাদিয়ার মা সাগরিকা বলেন, প্রথমে জ্বর, ঠান্ডা, কাশি এবং বুকে ব্যথার কারণে তার শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। গত তিন দিন ধরে তাঁর শরীরে হামের মতো গুটি বা র্যাশ দেখা যাচ্ছে, যার ফলে জ্বরের মাত্রা আরও বেড়েছে। কোনো কিছু খেতে পারছেন না। চিকিৎসা হিসেবে বর্তমানে স্যালাইন এবং ওষুধ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু জ্বরের কোনো উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।চিকিৎসক এসে তার সন্তানকে দেখেছেন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও স্যালাইন লিখে দিয়েছেন, যা বর্তমানে চলছে।
চার মাস বয়সী মাহিরার পিতা তামিম হোসেন বলেন, তার শিশুর নিউমোনিয়া হয়েছিল এবং তার চিকিৎসা চলছিল। এর মধ্যে গতকাল থেকে বাচ্চার শরীরে হামের লক্ষণ দেখা গেছে। আজ সকালে ডাক্তার এসে বাচ্চাকে দেখেছেন ও ওষুধের ধরণ পরিবর্তন করেছেন। বাচ্চার বয়স এখন চার মাস। এ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সব টিকাই তাকে দেওয়া হয়েছে, তবে অসুস্থতার কারণে সর্বশেষ একটি টিকা এখনো দেওয়া সম্ভব হয়নি।
সিনিয়র স্টাফ নার্স শিরিন সুলতানা বলেন, বর্তমানে প্রচুর পরিমাণে হাম ও পক্স আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। রোগীর চাপ এতই বেশি যে অনেক সময় তিল ধারণের জায়গা থাকছে না। শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্ক—উভয় বয়সের রোগীই হামে আক্রান্ত হচ্ছেন। আগে এই রোগের চিকিৎসা সাধারণত বাড়িতেই করা হতো, কিন্তু বর্তমানে সংক্রমণের মাত্রা এতই বেশি যে রোগীরা বাধ্য হয়ে হাসপাতালে আসছেন। নার্স এবং চিকিৎসকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্তরিকতার সাথে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তারা রোগীদের ক্যানুলা করা, ওষুধ দেওয়া, অক্সিজেন সরবরাহ এবং নেবুলাইজারসহ সব ধরনের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা প্রদান করছেন। আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে তীব্র জ্বর, শ্বাসকষ্ট এবং খিঁচুনিসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে পক্স আক্রান্ত রোগীদের অবস্থা অনেক সময় বেশ আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ছে।
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের রেজিস্ট্রার ডা. আফসার আলী জানান, গত তিন মাসে ৪৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছিল এবং তারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তিনি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার পরও সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা গবেষণা করছেন।
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার হুসাইন শাফায়াত বলেন, সারা দেশেই হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আমাদের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এখানে আসলে পাবলিক হেলথের সাথেও সম্পর্ক আছে, ক্লিনিক্যাল সাইডেও সম্পর্ক আছে। পাবলিক হেলথ নিয়ে সিভিল সার্জনের দপ্তর কাজ করে থাকে। আর আমরা ক্লিনিক্যাল যে রোগী আসলে তাদের বেসিক ট্রিটমেন্টগুলো দিয়ে থাকি। আর টিকাদানের একটা সেন্টার রয়েছে আমরা সেখানে টিকা দিয়ে থাকি। হামের টিকা চলমান রয়েছে। আর সেইসাথে হামের রোগী যারা আসছে তাদের জন্য আইসোলেশন ওয়ার্ড খুলতে বলা হয়েছে। আমরা যেটাকে ডায়রিয়া ওয়ার্ড বলে জানি আসলে সেটাই আমাদের আইসোলেশন ওয়ার্ড। ডায়রিয়া ছাড়াও সেখানে আমরা হামের রোগী অথবা পক্সের রোগী রেখে থাকি। ওখানে আমরা আলাদাভাবে দুইটা কেবিন ডেডিকেটেড করেছি। আমাদের উদ্দেশ্য হলো এরকম রোগী আসলে ওই কেবিনের মধ্যে রেখে দিব, তাহলে তারা বেশি বাইরে যাওয়া লাগবে না। অ্যাটাচড টয়লেটও আছে।তাহলে অন্য রোগীদের ছড়াবে না। তো সেই হিসেবে আমাদের একটা কেবিনে দুইটা রোগী ভর্তি আছে ওখানে। আর একটা নতুন রোগী হাম নিয়ে এসেছে, আমার যে তথ্য পেয়েছি সেটা তাকেও কেবিনেই রাখা হয়েছে। শিশু বিভাগে একটা কেবিন আছে ওখানে তাকে রাখা হয়েছে আলাদা করে। আর আরো দুইটা কি তিনটা সন্দেহজনক রোগী রয়েছে। তাদের হাম সন্দেহ হচ্ছে। হাম সন্দেহ হলে কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণ লাগে। সেটা দেখে কনফার্ম হলে তখন তাকে হাম হিসেবে ঘোষণা দিয়ে আইসোলেশনের আওতায় আনা হবে। তো সামগ্রিকভাবে আমাদের এই কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের সেবা দিচ্ছি এবং দেওয়ার চেষ্টা করছি।
আপনার মতামত লিখুন :