ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কোন্নয়নে গলার কাঁটা শেখ হাসিনা
সাইফুল্লাহ খালিদ
নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:০১
স্বপ্নভূমি ডেস্ক:
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কোন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে তাঁর অব্যাহত রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। অনুকূল পরিবেশ না থাকার কারণ দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ। এর জন্য শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ফলে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার অব্যাহত রাজনৈতিক বক্তব্যই গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক এক নতুন স্পর্শকাতর ও জটিল মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে কাজ করছিলেন দুই দেশের কর্মকর্তারা। সফরের দিনক্ষণও প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। তবে ৫ আগস্ট নয়দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান প্রস্তাবিত এ সফরে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। রবিবার প্রধানমন্ত্রীর সফরের অনুকূল পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রক্রিয়া হিসেবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যার আসামিদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ফেরত দিতে একাধিকবার ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। তবে ভারত বরাবরই বলে আসছে, ‘শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে বাংলাদেশের অনুরোধ খতিয়ে দেখছে তারা।
’ সরকারের ভাষ্য, মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তিকে আশ্রয় দিয়ে ভারত দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের অস্বস্তি জিইয়ে রাখছে।অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের জন্য অবস্থান নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর বেশি নির্ভরশীল থাকা দিল্লি এখন ঢাকার নতুন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাইছে। কিন্তু ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান এবং সেখান থেকে অব্যাহত রাজনৈতিক তৎপরতা চালানো বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব আরও উসকে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকা-দিল্লি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পানিবণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে অগ্রগতি বজায় রাখতে হলে এ রাজনৈতিক সংকট দূর করা জরুরি। তবে শেখ হাসিনার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট সমঝোতায় না পৌঁছানো পর্যন্ত দুই দেশের টানাপোড়েন কমার সম্ভাবনা কম। ফলে বাংলাদেশ-ভারতের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সম্পর্ক বজায় রাখার পথে শেখ হাসিনার বর্তমান রাজনৈতিক রূপ ও ভারতে উপস্থিতিই প্রধান গলার কাঁটা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আলোচনার দরজা একেবারেই বন্ধ করে দেওয়া ভালো লক্ষণ নয়। কূটনীতিতে সবসময়ই একটা সুযোগ রেখে দিতে হয়। যে কোনো সমস্যা, সংকট আলোচনার মাধ্যমেই সমাধাণ সম্ভব। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. হুমায়ুন কবির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকারের বক্তব্য দেখে মনে হচ্ছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের সঙ্গে এখনো আলাপ-আলোচনা চলছে। যেহেতু আমরা প্রতিবেশী, কাজেই আমাদের পারস্পরিক যোগাযোগ থাকবে। সফর না হলেই যে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে বিষয়টি এমন নয়। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হলে সম্পর্কটা আরও এগিয়ে নিতে সুবিধা হতো। সফর এখনই না হওয়ায় আপাতত এই সুবিধাটা পাওয়া যাবে না।
এদিকে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বৈঠকে বসলে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন সমস্যা ও মতপার্থক্য সহজে সমাধান করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন ঢাকায় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর আরও দ্রুত হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। রবিবার রাতে এক নৈশভোজে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকের মাধ্যমেই কেবল সমস্যাগুলোর সমাধান করা সম্ভব। আমি এ বিষয়ে খুবই আশাবাদী। বাংলাদেশ ও ভারত দুটি সার্বভৌম দেশ। দুই দেশেরই নিজেদের সমস্যা, মতপার্থক্য ও বিরোধ রয়েছে। তবে আলোচনার মাধ্যমে এসব বিষয় সমাধান করা সম্ভব। তিনি বলেন, আমাদের মতপার্থক্য আছে, তর্কবিতর্কও আছে। এতে সমস্যা নেই। তবে দুই দেশকে পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদা বজায় রেখে অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের পক্ষ থেকেই সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে বিএনপি সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লার উপস্থিতি এবং তার আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এ ছাড়া তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পরপরই ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান নরেন্দ্র মোদি। পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করেন। সব মিলিয়ে দুই দেশের পক্ষ থেকেই আস্থা বৃদ্ধির চেষ্টা অব্যাহত ছিল। কিন্তু এর মধ্যেই দুই সরকারের মধ্যে অস্বস্তির বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায় দিল্লিতে শেখ হাসিনার একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের ঘটনা। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী ৫ আগস্টে নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। যদিও ওই সংবাদ সম্মেলনের একদিন আগেই ভারতের মাটি ব্যবহার করে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার না করতে দেশটির সরকারের সহযোগিতা চেয়েছিল বাংলাদেশ। সংবাদ সম্মেলনে পরপরই শেখ হাসিনার গণমাধ্যমে কথা বলার দিনেই রাতে কড়া ভাষায় একটি বিবৃতি দেয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
আপনার মতামত লিখুন :