সহিংসতা ও লুটপাট রুখতে ফ্রান্সে নামছে সেনাবাহিনী, গাফিলতির দায় স্বীকার প্রধানমন্ত্রীর
শাহরিয়ার সীমান্ত
নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারের বাজেট সংকটের জেরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অভূতপূর্ব বিক্ষোভ, সহিংসতা ও লুটপাট ঠেকাতে শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফ্রান্স। দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ ল্যকোড়নু (Sébastien Lecornu) এ ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যর্থতা ও সরকারের কৌশলগত ভুলের দায়ও স্বীকার করে নিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার ফ্রান্সের পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী ২৪ অক্টোবর (শনিবার) থেকে রাজধানী প্যারিসসহ দেশের অন্যান্য প্রধান প্রধান শহরের দাঙ্গাপ্রবণ এলাকাগুলোতে ব্যাপক পরিসরে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হবে। পাশাপাশি চালানো হবে বৃহৎ আকারের নিরাপত্তা অভিযান।
পার্লামেন্ট অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ল্যকোড়নু বলেন, গত ১৭ অক্টোবর প্যারিস, মার্সেই ও লিওঁসহ বড় শহরগুলোতে ব্যাপক দাঙ্গা ও দোকানপাটে লুটপাট চালানো হয়। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
বিক্ষোভ দমনে গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি, পুলিশের মোতায়েন প্রক্রিয়া স্থবির থাকা এবং পুলিশের পূর্বনির্ধারিত ছুটি বাতিল না করাকে সরকারের বড় ভুল হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজও ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে বলেন, “যা ঘটেছে তার জন্য আমি গভীরভাবে দুঃখিত। আমি আমার দায়ভার স্বীকার করছি।”
ঘটনার গভীর তদন্তে পার্লামেন্ট একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেছে। সহিংসতায় জড়িতদের শনাক্তে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ২০০ গোয়েন্দা সদস্য। ইতোমধ্যে লিমোজেস শহরের ঐতিহাসিক টাউন হলে অগ্নিসংযোগের অভিযোগে উগ্র-বামপন্থী গোষ্ঠীর এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সামনে থাকা দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ সহিংসতা রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম উত্তেজনা তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী ল্যকোড়নু এই অস্থিরতার জন্য উগ্র-বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করলেও, বিরোধী দল ও বিক্ষোভকারীদের দাবি—জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় ও জনসেবার মান কমে যাওয়ার ফলে জনগণের মধ্যে যে ক্ষোভ জমা হয়েছিল, সরকার তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে।
এদিকে, দেশের রাজনৈতিক সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতেও। ফ্রান্সের ঋণ গ্রহণের ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে এবং ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ইল্ড (মুনাফার হার) গত ২৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। খ্যাতনামা সুপারমার্কেট চেইন ‘ক্যারেফোর’ জানিয়েছে, সহিংসতা ও ভাঙচুরে তাদের কয়েক কোটি ইউরোর ক্ষতি হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের বেশ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কারফিউ জারি করা হয়েছে, যা ১৮ বছরের কম বয়সীদের ওপর কঠোরভাবে প্রযোজ্য হবে।
তবে সরকারের এই পদক্ষেপে পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হওয়ার লক্ষণ নেই। দেশের প্রধান ছাত্র সংগঠন ‘ইউএনইএফ’ (UNEF) আগামী শনিবার সরকারবিরোধী আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। এছাড়া জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ২০১৮ সালের মতো আবারও রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছে আলোচিত ‘হলুদ ভেস্ট’ (Yellow Vests) আন্দোলনকারীরা। ফ্রান্স পেরিয়ে ইতালি ও আলবেনিয়াতেও এই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ায় পুরো ইউরোপজুড়ে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
(সূত্র: রয়টার্স)
আপনার মতামত লিখুন :